ভোটের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনের আর এক মাসেরও কম সময় বাকি। এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো—আমরা কি একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের জন্য সত্যিই প্রস্তুত?
ইতোমধ্যেই একই দিনে সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তে ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়েছে। এটি ভোটগ্রহণের স্বাভাবিক প্রবাহকে ব্যাহত করার আশঙ্কা তৈরি করছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি আদৌ একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই? যদি সত্যিই চাই, তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের সুস্পষ্ট ও সুচিন্তিত কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
সুষ্ঠু নির্বাচনের কয়েকটি মৌলিক সূচক যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখা যায়—সর্বস্তরের মানুষ এখনো আশ্বস্ত নন। নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সরকারের উদ্যোগ ও অর্জন শূন্যের কোটায়।
চিন্তার বিষয় হলো, সম্ভাব্য ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ -এর পন্থাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে কি না এবং সেগুলো প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না। এই বিষয়গুলো শুধু নির্বাচন কমিশন বা সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা রাজনৈতিক দল ও সাধারণ জনগণের কাছেও পরিষ্কার ও দৃশ্যমান হতে হবে।
প্রায়ই আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কিছু সাধারণ বক্তব্য ও নীতিবাক্য শুনে থাকি—সুষ্ঠু নির্বাচন করা হবে, অবৈধ টাকা ও বেশি শক্তি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোনো বাস্তবসম্মত নীতিমালা বা কার্যকর কর্মপরিকল্পনা কি তৈরি হয়েছে? ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ -এর কথা সবাই বলেন, কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার এবং কীভাবে তা নিশ্চিত করা হবে—সে বিষয়ে নীরবতা উদ্বেগজনক।
অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে সরকার একটি পাতানো নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। যদি সত্যিই তা ঘটে, তবে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রশ্নবিদ্ধ বা বিতর্কিত নির্বাচনের কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—সে বিষয়ে কি ভেবে দেখেছে? এবং এর ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের দায়ভার শেষ পর্যন্ত কে নেবে?
যদি দৃশ্যমান প্রস্তুতি না থাকে, তবে নির্বাচন নিয়ে জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের দায়িত্ব ছিল দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু তা না করে যদি সবকিছু ঢিলেঢালা অবস্থায় চলতে থাকে, তবে আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে কি কোনো স্পষ্ট ও দৃঢ় বার্তা পৌঁছেছে, যা মানুষকে আশ্বস্ত করবে যে যেকোনো মূল্যে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে? এবং সেই সঙ্গে এই অঙ্গীকারও থাকবে যে আমরা জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে ব্যর্থ হতে দেব না।
বাস্তবতা হলো, জুলাই আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করছে জুলাই-পরবর্তী আমাদের কার্যক্রমের ওপর। শুধু নির্বাচন আয়োজন নয়, তার পরবর্তী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণই নির্ধারণ করবে আমরা সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পথে এগোচ্ছি কি না।



