ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার উত্তর পশ্চিম তীরে তাদের সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত করেছে। ক্যালকিলিয়ার কফর সাবা এলাকায় ভোররাতে হানা দিয়ে কড়াকড়ি কারফিউ জারি করে সৈন্যরা। শহরজুড়ে টহল ও বাড়ি-বাড়ি তল্লাশি চালানো হয় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
জেনিনের দক্ষিণে মাসলিয়া শহরে কয়েক ঘণ্টার অভিযানের পর সেনারা সরে গেলেও টাউনজুড়ে হামলার ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। পাশাপাশি নিকটবর্তী কাবাতিয়ায় টানা তৃতীয় দিনের মতো অভিযান, চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও বারবার গৃহতল্লাশি চলছে।
গত সপ্তাহ থেকে তুবাস ও তাম্মুনে অভিযান শুরুর পর উত্তরের পশ্চিম তীরজুড়ে তল্লাশি, কারফিউ, ব্যাপক আটক ও অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা বেড়ে গেছে। অক্টোবর ২০২৩ থেকে এ পর্যন্ত দখলীকৃত এই অঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১,০৮৭ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১০,৭০০ জন আহত হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২০,৫০০ জনের বেশি।
জুলাই ২০২৪-এ আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের উপস্থিতিকে “অবৈধ” ঘোষণা করে সমস্ত বসতি উচ্ছেদের আহ্বান জানায়।
গাজায় যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি চলমান থাকা সত্ত্বেও বুধবার ইসরায়েলি হামলায় অন্তত সাতজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুই শিশু রয়েছে। সেনাবাহিনী দাবি করেছে, রাফাহ অঞ্চলে হামাস যোদ্ধাদের আক্রমণে চার ইসরায়েলি সৈন্য আহত হওয়ার পর তারা পাল্টা হামলা চালায়।
উত্তর গাজার জায়তুন এলাকায় গুলিতে দু’জন নিহত হয়, আর দক্ষিণের আল-মাওয়াসি এলাকায় টেন্ট ক্যাম্পে বোমাবর্ষণে পাঁচজন প্রাণ হারায়। এই হামলায় আগুন ধরে গিয়ে বহু তাবু পুড়ে যায়। কুয়েতি হাসপাতাল জানিয়েছে, নিহত দুই শিশুর বয়স ছিল ৮ ও ১০ বছর।
হামাস এটিকে “যুদ্ধাপরাধ” বলে নিন্দা জানিয়ে মিসর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়েছে। গাজা কর্তৃপক্ষ বলছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে ইসরায়েল ৫৯১ বার তা লঙ্ঘন করেছে।
এ দিনই ইসরায়েল জানিয়েছে, রাফাহ সীমান্ত ক্রসিং “শুধু গাজাবাসীর বের হওয়ার জন্য” খুলে দেওয়া হবে। যারা যেতে চাইবে, তাদেরকে “নিরাপত্তা অনুমোদন” নিতে হবে। এই ঘোষণা ঘিরে শঙ্কা তৈরি হয়েছে—এটি ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত করার প্রক্রিয়া হতে পারে।
মিসর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা একমুখী চলাচলে রাজি নয়। কায়রো বলছে, ক্রসিং খুলতে হলে যাতায়াত দুই দিকেই হতে হবে। মিসর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশন ২৮০৩-এর প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি ও সব ক্রসিং খোলার কথা বলেছে।
জাতিসংঘও রাফাহ “সম্পূর্ণভাবে” খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, গাজার বাসিন্দারা যেন স্বেচ্ছায় যেতে ও ফিরে আসতে পারে—এটা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বন্দি বিনিময়ের অংশ হিসেবে এখন পর্যন্ত হামাস ২০ জন জীবিত বন্দি এবং ২৬টি মৃতদেহ ফেরত দিয়েছে, বিনিময়ে মুক্তি পেয়েছে প্রায় ২,০০০ ফিলিস্তিনি বন্দি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার প্রথম ধাপে রাফাহ ক্রসিং দুই দিকেই খোলা, বিপুল মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং বন্দি বিনিময় অন্তর্ভুক্ত হলেও বাস্তবে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত সহায়তা সীমিত রেখেছে।
এদিকে চিকিৎসাসেবার সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত গাজা থেকে ৮,০০০ এর বেশি রোগীকে সরিয়ে নেওয়া গেলেও এখনও ১৬,৫০০ এর বেশি গুরুতর অসুস্থ বা আহত মানুষ চিকিৎসার জন্য বাহিরে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
ইতালি, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তুলনামূলক বেশি রোগী নিলেও ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ এখনও খুব সীমিত সংখ্যক মানবিক রোগী গ্রহণ করেছে।
ইসরায়েলের অব্যাহত যুদ্ধ ও হামলায় অক্টোবর ২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৭০,১১৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ১,৭০,৯৯৯ জন। অপরদিকে ৭ অক্টোবর ২০২৩ হামলায় ইসরায়েলে নিহত হন ১,১৩৯ জন এবং প্রায় ২০০ জনকে জিম্মা করা হয়।



