ওসমান হাদির সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, রাজনৈতিক বিভ্রান্তি ও গণমাধ্যমের দায়িত্বহীনতার সম্মিলিত প্রতিফলন। এই ঘটনার দায় কোনো একক পক্ষের ওপর চাপিয়ে দিলে বাস্তবতা আড়াল করা হবে। সত্য হলো—এই ব্যর্থতার দায় আমরা সবাই এড়াতে পারি না।
প্রথমেই প্রশ্ন আসে সরকারের ভূমিকা নিয়ে। একটি কার্যকর রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরকার এখনো স্পষ্ট ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সংগঠিত সহিংস নেটওয়ার্ক ভাঙা কিংবা দায়ীদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে যে দৃঢ়তা প্রয়োজন ছিল, তা দেখা যায়নি। আরও উদ্বেগজনক হলো—রাষ্ট্রের প্রায় সব সেক্টরে পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সেটআপ প্রায় অপরিবর্তিত রেখে দেওয়া হয়েছে, যা ন্যায়বিচার ও সংস্কারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার এখনো আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী শক্তিকে পরিষ্কার বার্তা দিতে পারেনি—অপরাধ করলে বিচার হবেই, রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ঢাল নয়।
নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গোয়েন্দা ব্যর্থতা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাব এবং মাঠপর্যায়ের নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। একটি দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিককেই অনিরাপদ করে তোলে।
সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতাও কম নয়। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যেখানে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন, সেখানে আবারও বিভাজনের রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। কিছু দল রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আওয়ামী লীগের স্টেকহোল্ডারদের প্রতি অযৌক্তিক সহানুভূতি দেখাচ্ছে, যা জনগণের ক্ষোভ ও হতাশা বাড়াচ্ছে। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে না পারা, সংস্কার এড়িয়ে যাওয়া এবং জনমতকে সঠিকভাবে বুঝতে ব্যর্থ হওয়াই রাজনৈতিক আস্থার সংকটকে গভীর করছে।
সবচেয়ে হতাশাজনক ভূমিকা এসেছে গণমাধ্যম ও সমাজের তথাকথিত মুখপাত্রদের একটি অংশ থেকে। কিছু গণমাধ্যম এখনো আওয়ামী লীগের একটি ‘নরম’ ধারার রাজনীতির পুনর্বাসনমূলক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। সত্য অনুসন্ধানের বদলে নীরবতা, অন্ধ পক্ষপাত কিংবা প্রভাবিত সংবাদ পরিবেশন গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। গণমাধ্যম যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তবে সমাজ অন্ধকারেই থেকে যায়।
এই বাস্তবতায় স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—এই ঘটনার দায় কেউ এড়াতে পারে না। দায় স্বীকার না করলে জবাবদিহি আসে না, আর জবাবদিহি ছাড়া সংস্কার অসম্ভব। এখন সময় অজুহাতের নয়, সময় সাহসী সিদ্ধান্তের। ন্যায়বিচার, প্রকৃত সংস্কার, রাজনৈতিক ঐক্য এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম—এই চার স্তম্ভ শক্ত না হলে ওসমান হাদির মতো ঘটনা বারবার ফিরে আসবে।
রাষ্ট্র যদি জনগণের হয়, তবে জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায়ের প্রশ্নে কোনো আপস চলতে পারে না।



